বৃহস্পতিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০১৮

নফস

"নফস বা আত্মা, তার রূপ এবং নফস বা আত্মার বৈশিষ্ট্য" 
[কুরআনুল কারীম থেকে]
নফসের পরিশুদ্ধতা ছাড়া মুমিন হওয়া সম্ভবপর নয় এবং কোন পাপ কাজ থেকে বেচে থাকাও সম্ভব নয়। মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া নফসকে নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব নয়। তাই নফসকে পরিশুদ্ধ করার জন্য সদা সর্বদা মহান আল্লাহর নিকট পানাহ চাইতে হবে। সব সময় আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করতে হবে এবং নফসকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে হবে; তাহলে পাপ কাজ বা খারাপ কাজ থেকে বেচে থাকতে আল্লাহ সাহায্য করবেন। 
মহান আল্লাহ বলেছেনঃ 
"যে ব্যক্তি নিজেকে পরিশুদ্ধ করে, সেই সফলকাম হয় এবং বিফলকাম বা ব্যর্থ হয় সেই ব্যক্তি, যে নিজেকে পাপাচারে কলুষিত করে"।
(সূরা আশ-শামসঃ আয়াতঃ ৯-১০)
নফসের কার্যক্রম ও বিভিন্ন অবস্থানের কারনে নফসকে তথা মানুষকে বা তার কার্যক্রমকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করা হয়ে থাকে। 
মহান আল্লাহ বলেছেনঃ 
"আল্লাহর নিকট মানুষের মর্যাদা বিভিন্ন স্তরের এবং আল্লাহ দেখেন যা কিছু তারা করে"।
(সূরা আল-ইমরানঃ আয়াত-১৬৩)
★ নফস বা আত্মার বৈশিষ্ট্য:
মানব আত্মা বা নফস মহান আল্লাহর এক বিস্ময়কর ও রহস্যময় সৃষ্টি। এসব বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা, গবেষণা ও অনুসন্ধান অহরহ চলছে। মানব জন্মের সাথে তার রূহ বা আত্মা কিভাবে দেহে সংযুক্ত হয় বা প্রবেশ করে তা অদ্যাপি অজ্ঞাত। আত্মা দেহকে সঞ্জীবিত করে তোলে এবং দেহে গতি সঞ্চার করে। অন্য দিকে দেহ ছাড়া আত্মার স্বরূপ অনুভূত হয় না বা জানা যায় না। দেহ-মন একীভূত হয়ে থাকলেও এদের মধ্যে কোনো অনিবার্য সম্পর্ক নেই- আত্মা মুক্ত স্বাধীন স্বতন্ত্র এবং স্বীয় বৈশিষ্ট্যে মহীয়ান। দেহ ছাড়াও আত্মা থাকতে পারে- তবে আত্মা ছাড়া দেহ অচল নির্জীব এবং নিরেট জড় পদার্থ মাত্র। মানুষের সব ক্রিয়াকাণ্ডের মূলে রয়েছে মন বা আত্মার সক্রিয় ভূমিকা। শরীর বা দেহ আত্মার নির্দেশ পালনের হাতিয়ার স্বরূপ- আত্মার হুকুম তামিল করার জন্য সে সদা প্রস্তুত। মনে হলো কমলা লেবু খাবো- মনের এই ইচ্ছা প্রতিপালনের জন্য দেহে গতি সঞ্চার হয় এবং ইচ্ছা পরিপূরণের জন্য দেহ সক্রিয় হয়ে ওঠে। যথা: 
হস্ত সঞ্চালন করে টেবিল থেকে কমলাটি তুলে নেয়া, এর খোসা মুক্ত করা এবং কোষ মুখ গহবরে পুরে দেয়া ইত্যাদি। দেহে অবস্থিত আত্মাই এসব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আত্মার মূলত দু’টি প্রবৃত্তি রয়েছে: সুপ্রবৃত্তি এবং কুপ্রবৃত্তি অথবা বলা চলে বুদ্ধিবৃত্তি ও জীববৃত্তি। সুপ্রবৃত্তি মানুষকে ন্যায়, সৎ ও সঠিক পথ নির্দেশ করে অন্য দিকে কুপ্রবৃত্তি মানুষকে অন্যায়, অসৎ ও বিপথে পরিচালিত করে।
মানব জীবনে চলছে, ‘সু’ ও ‘কু’ এই দুই বৃত্তির অভিনব খেলা। ‘সু’ টানছে সত্যের পথে ‘কু’ প্ররোচিত করছে অসত্য ও মিথ্যার পানে। কখনো ‘সু’ মন বা আত্মার ওপর এর প্রভাব বিস্তার করে আবার কখনো কখনো ‘কু’-এর আধিক্য প্রবল হয়ে ওঠে- এই দোদুল্যমানতার ভেতর দিয়েই চলছে জীবন প্রবাহ। ইসলাম এক পবিত্র ধর্ম এবং এই ধর্মের মহাগ্রন্থ’ হলো আল-কুরআন আল্লাহর বাণী। সৃষ্টি জগতে এমন কোন বিষয় নেই যা পবিত্র কুরআনে পরিব্যক্ত হয়নি। মন-আত্মা, রূহ বা নফস সংক্রান্ত বিষয়েও এখানে আলোচিত হয়েছে। ইসলামের পরিভাষায় ‘নফস’-কে সাধারণত তিন স্তরে বা ত্রিস্তরে বিন্যস্ত করা হয়। নফসের কার্যক্রম ও বিভিন্ন অবস্থানের কারনে কুরআনুল কারীমে মানুষের নফসের তিনটি রূপ উল্লেখ করা হয়েছে। যথাঃ 
১) নফসে আম্মারা বা কু-প্রবৃত্তিমূলক আত্মা, 
২) নফসে লাউয়ামাহ বা বিবেক তাড়িত বা ধিক্কারজনিত আত্মা এবং 
৩) নফসে মুতমাইন্নাহ বা প্রশান্ত আত্মা বা প্রফুল্ল চিত্ত।
নফসের কার্যক্রম ও বিভিন্ন অবস্থানের কারনে কুরআনুল কারীমে মানুষের নফসের তিনটি রূপ উল্লেখ করা হয়েছে।
যথাঃ 
১) নফসে আম্মারাঃ 
একটি ‘নফস’ মানুষকে মন্দ কাজে প্ররোচিত করে। এটির নাম ‘নফসে আম্মারা’। যেমনঃ
আল্লাহ বলেছেনঃ
"আমি নিজেকে নির্দোষ বলি না। নিশ্চয় মানুষের মন মন্দ কর্মপ্রবণ কিন্তু সে নয়-আমার পালনকর্তা যার প্রতি অনুগ্রহ করেন। নিশ্চয় আমার পালনকর্তা ক্ষমাশীল, দয়ালু"।
(সুরা ইউসুফঃ আয়াত-৫৩) 
নফসে আম্মারা'ই মানুষকে খারাপ কাজ করায়। তাই এটা দমন করাই হল মুমিনের প্রথম কাজ। সকল খারাপ কাজ থেকে মুক্ত থাকার জন্য মহান আল্লাহর নিকট পানাহ চাইতে হবে।
মহান আল্লাহ বলেছেনঃ 
"হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদের অন্তরের আলো বা নূরকে পূর্ণ করে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয় আপনি সবকিছুর উপর সর্ব শক্তিমান"।
(সূরা আত্ব-তাহরীমঃ আয়াত-৮)
অনেকে আবার নফসে আম্মারা'কে ষড় রিপু বলেছেন। তারা আরও বলেছেন, ষড় রিপু ছাড়াও আরও ১২টি কু-রিপু আছে বা মানুষের অন্তরে কাজ করে।
২) নফসে লাউয়ামাহঃ 
তিরষ্কারকারী আত্মাই হল নফসে লাউয়ামাহ। একটি ‘নফস’ ভুল বা অন্যায় কাজ করলে অথবা ভুল বা অন্যায় বিষয়ে চিন্তা করলে কিংবা খারাপ নিয়ত রাখলে লজ্জিত হয় এবং সেজন্য মানুষকে তিরস্কার ও ভৎর্সনা করে। আধুনিক পরিভাষায় একেই আমরা বিবেক বলে থাকি। যেমনঃ মন
আল্লাহ বলেছেনঃ 
"আমি শপথ করি কিয়ামত দিবসের এবং আরও শপথ করি সেই মনের, যে নিজেকে ধিক্কার দেয়"। 
(সূরা ক্বিয়ামাহঃ আয়াতঃ ১-২)
৩) নফসে মুতমাইন্নাহঃ 
যে নফসটি সঠিক পথে চললে এবং ভুল ও অন্যায়ের পথ পরিত্যাগ করলে তৃপ্তি ও প্রশান্তি অনুভব করে তাকে বলে ‘নফসে মুতমাইন্নাহ’। 
আল্লাহ বলেছেনঃ 
"হে প্রশান্ত মন, তুমি তোমার পালনকর্তার নিকট ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বিশিষ্ট বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর"।
(সূরা আল ফাজরঃ আয়াতঃ ২৭-৩০)
নবী-রাসুল, অলী-আউলিয়া মুমিন বান্দাদের বেলায়ই নফসে 'লাউয়ামাহ' এবং নফসে 'মুতমাইন্নাহ' কাজ করে। তারা নফসে 'আম্মারা'-এর কলুষ থেকে মুক্ত থাকে।
কিছু আলেম-উলামা নফসকে আরও দুইটি ভাগে বৃদ্ধি করেছেন। যেমনঃ- 
১) নফসে মুলহেমাঃ 
"কসম বা শপথ মানুষের আত্মার বা প্রাণের এবং যিনি মানুষকে আকৃতিতে সুবিন্যস্ত ও সুঠাম করেছেন, অতঃপর তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান বা তাকওয়া দান করেছেন"।
(সূরা আশ-শামসঃ আয়াতঃ ৭-৮) 
এই আয়াতদ্বয়ের তাৎপর্য্য হলঃ যেগুলো মন্দ কাজ সেগুলো পরিত্যাগ করতে হবে এবং যেগুলো পূন্যের কাজ সেগুলোকে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহর অনুগ্রহেই এটা হয়ে থাকে। যেমনঃ খিজির(আঃ) নবী মূসা(আঃ)-কে বলেছিলেনঃ "আমি নিজের ইচ্ছায় কিছুই করিনি এবং এই ইচ্ছা যাতে তুমি সবর করতে পারনি- তারতাবীল"। 
এখানে বুঝানো হয়েছে যে, আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্তরা এলহাম প্রাপ্ত হয়েই সব কিছু করে থাকেন। যাহা সাধারন মানুষ অনুধাবন করতে পারে না এবং বোধগম্য না হলেও - তা কল্যানময়। 
২) নফসে রহমানীঃ 
এই শ্রেনীর নফস সম্পৰ্কে কিছু আলেম বলেছেন যে, নফসে মুলহেমা কায়েম-দায়েম হলে এবং রহমানুর রহীম আল্লাহর খাসলত হাসিল হলেই নফসে রহমানী লাভ সম্ভবপর হয়। যেমনঃ
আল্লাহ বলেছেনঃ 
"আমরা আল্লাহর রং গ্রহণ করেছি। আল্লাহর রং এর চাইতে উত্তম রং আর কার হতে পারে? আমরা তাঁরই এবাদত করি"।
(সূরা বাকারাহঃ আয়াত-১৩৮)
আলেমরা এই আয়াতের অর্থকে বুঝিয়েছেন, আল্লাহর গুনে গুনান্নিত হও, আল্লাহর শানে শানান্নিত হও। তাই যদি কেউ রহমানুর রহীমের খাসলত ধারন করতে পারে, তবে তারাই হবে পূন্যময় এবং সর্বোত্তম। যেমনঃ
আল্লাহ বলেছেনঃ 
"আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতর আকৃতিতে বা অবয়বে"।
(সূরা আত্ব-তীনঃ আয়াত-৪)
আল্লাহু আলেম। আল্লাহু আলেম। আল্লাহু আলেম।
'নফস' সম্পর্কেে আলেম-উলামা ও সুফীদের বানী সমূহঃ 
[বানীসমূহ সংগৃহিত]
নফসের লালসা দমনে যে অক্ষম, সে দূবর্লতম মানুষ। আর যে সক্ষম সে সবার্পেক্ষা শক্তিশালী। 
***হযরত ইব্রাহিম দাউদ রুকী (রহঃ)।
নফসের কারাগারে যে বন্দী, সে আল্লাহর দরবারে পৌছতে পারে না । 
**হযরত ইবনে আতা (রহঃ)।
নফসের অনুগত হওয়া আর কারাবরনে কোন পাথর্ক্য নাই। 
***হযরত আবু উসমান হিরী (রহঃ)।
আল্লাহর কাজে নফসকে বের করে দেয়াই হল বিশুদ্ধতার পরিচয়।
**হযরত জোনায়েদ বাগদাদী (রহঃ)।
শয়তান ও নফসের প্রলোভনের মধ্যে পাথর্ক্য হল লা-হাওলা কালিমা পাঠ করে শয়তানের ছলনা থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় কিন্তু নফসকে তাড়ানো কঠিন, সে যা চায় তা না পাওয়া পযর্ন্ত পিছু হটে না। কখনো কখনো হয়তোবা উদ্দেশ্য পূরনে বিরত হয়। কিন্তু অচিরেই সুপ্ত আকাংখাকে সে পুনরুজ্জীবিত করে। অতএব নফস শয়তান অপেক্ষা শক্তিশালী। আর এর মোকাবেলা করার জন্য পীরের দীক্ষা নিতে হয়।
***হযরত জোনায়েদ বাগদাদী (রহঃ)।
অন্তরকে পবিত্র রাখার অবলম্বনই হলো নফসকে সংযত রাখা। 
***হযরত আহমদ ইবনে আসেম এন্তাকী (রহঃ)।
নফসের অনুসরন মানুষের সবর্নাশ ডেকে আনে। আর বিপদে অধৈয্যর্শীল মানুষ পরলৌকিক বিপদে জড়িয়ে পড়বে।
***হযরত মানসুর আম্মার (রহঃ)।
নফসকে যে প্রিয় মনে করে সে নফসের দ্বারা ফেরাউনী কাজ করে অর্থ্যাৎ অন্যায় অপকর্ম করে তার অশুভ পরিনাম ভোগ করে। 
***হযরত হামদন কাচ্ছার (রহঃ)।
যিনি নফসের পবিত্রতা ও সরলতার প্রত্যাশী তিনিই আল্লাহর ওলী। 
***হযরত আবু হাফস হাদ্দাদ খোরাসানী (রহঃ)।
নফসকে চিনতে না পারলে আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়া কঠিন। অর্থ্যাৎ মন্দ প্রবৃত্তির তাড়নার প্রতি সজাগ না থাকলে আল্লাহর পথে চলা একেবারেই অসম্ভব। 
***হযরত সহল ইবনে আব্দুল্লাহ তসতরী (রহঃ)।
নফসকে শাসনে রাখাই হলো দুনিয়া ত্যাগের প্রথম সোপান, দুনিয়া ত্যাগ হল তাওয়াক্কুলের প্রথম, আল্লাহর তুষ্টি লাভের প্রথম সোপান। 
***হযরত সহল ইবনে আব্দুল্লাহ তসতরী (রহঃ)।
উদরপূর্ণ করে পানাহার করলে তা নফসের লালসার চরম মাত্রায় পৌছে দেয়। আর তখন মন্দ চাহিদাগুলো তাদের ইচ্ছা পূরনে উঠে পড়ে লেগে যায়। 
***হযরত সহল ইবনে আব্দুল্লাহ তসতরী (রহঃ)।
দুনিয়াতে নফস ব্যতীত কোন কিছুকেই আমি ভয় করি না।
***হযরত হাজী এমদাদুল্লাহ মোহাজিরে মক্কী।গোপনে বা প্রকাশ্যে পাপ চিন্তা করো না। নিজের নফসকে যেকোন পাপ কাজ থেকে বিরত রাখ। 
***হযরত হারেস মোহাসেবী (রহঃ)।
আমি যখন আমার নফসকে আল্লাহর দরবারে নিতে চাইলাম আর সে প্রত্যাখ্যান করলো তখন আমি একাই আল্লাহর দরবারে....
হাজির হলাম। 
***হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহঃ)।
[মন্তব্যঃ বায়েজীদ বোস্তামীর সুফীবাদী কথা- নাউজুবিল্লাহ]
মানুষের কু-প্রবৃত্তি প্রবল হলে অন্তর দুর্বল হয়, আর অন্তর সবল হলে কু-প্রবৃত্তি দুর্বল হয়]
***হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহঃ)।
নফসের বাসনা যে ত্যাগ করেছে সে অাল্লাহকে পেয়েছে। আর যে আল্লাহর নৈকট্য অজর্ন করেছে সবকিছুই তার নাগালে এসে গেছে। 
***হযরত বায়েজীদ বোস্তামী (রহঃ)।
যে ব্যক্তি কু-প্রবৃত্তি দমন করে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন হয়, আল্লাহ প্রকাশ্যে তার মযার্দা বৃদ্ধি করেন। 
***হযরত যুন্নুন মিশরী (রহঃ)।
যে সবসময় নফসের অনুগত শয়তান তার কাছে বেশি যাতায়াত করে না, কেননা সে মনে করে নফসের মাধ্যমেই শয়তানের কর্ম সম্পাদিত হয়ে থাকে। 
***হযরত মালেক বিন দিনার (রহঃ)।
মানুষের নফসকে খুব শক্ত শিকলে বেধে রাখতে হয়। পশুদের ক্ষেত্রে তেমন দরকার হয় না।
***হযরত হাসান বসরী (রহঃ)।
নফসকে সংযত রাখা ধৈর্য্যের লক্ষণ। 
***হযরত ইউসুফ আসবাত (রহঃ)।
নফসের বিরোধীতা করা সত্য ও সততার লক্ষন।
***হযরত ইউসুফ আসবাত (রহঃ)।
প্রকৃত সংযম ৪ টি। যথাঃ 
১) অল্প আহার করা
২) অল্প কথা বলা
৩) অল্প শয়ন করা এবং 
৪) নফসের কামনা ত্যাগ করা। 
***হযরত আবু ইয়াকুব ইবনে ইসহাক নহর জওয়ান (রহঃ)।
দুনিয়া ও নফস থেকে দূরে সরে যাওয়া হলো আল্লাহর সঙ্গে বন্ধত্বের কারন। 
***আবু মোঃ মোমতীয়েশ (রহঃ)।
নফসের তাড়না থেকে মুক্ত হওয়ার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত শান্তি। 
***হযরত আবু আব্দুল্লাহ ইবনে ফজল (রহঃ)।
মন্তব্যঃ 
ভাল এবং মন্দ এক সাথে বাস করে না এবং দুনিয়া ও আখেরাত একত্রে বাস করে না। আর তাইতো মহান আল্লাহ জান্নাত ও জাহান্নাম পৃথকভাবে সৃষ্টি করেছেন এবং যার যার কর্মফলের পুরস্কার হিসাবে সাজিয়ে রেখেছেন। 
মহান আল্লাহ বলেছেনঃ 
"আর যদি শয়তানের প্ররোচনা তোমাকে প্ররোচিত করে, তাহলে আল্লাহর শরণাপন্ন হও তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।"
(সূরা আল-আরাফঃ আয়াত-২০০) 
অতএব, আমার প্রার্থনা এই যেঃ- 
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ 
"হে অন্তর সমূহের পরিবর্তনকারী! তোমার দ্বীনের উপর আমার অন্তরকে অবিচল রাখ।"

মঙ্গলবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৭

প্রচলিত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে

প্রচলিত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মনুষ্যজাতি আশরাফুল মাখলুকাত, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, ইহুদি, হিন্দু, শিখ ইত্যাদি ধর্ম বলতে কোন ধর্ম নেই। উদাহরণতঃ হিন্দু বলতে স্থান ও ভাষাগত জাতি বুঝায়, ধর্মগত নয়। ঐতিহাসিকদের মতে হিন্দুকুশ, হিমালয় পর্বতের পাদদেশে, সিঁন্দু নদের অববাহিকায় অথবা হিন্দি ভাষাভাষীদের সাধারণতঃ হিন্দ, হিন্দি, সিঁন্দু ইত্যাদি থেকে হিন্দু বলা হয়। এ সকল এলাকায় মোসলেম, বৌদ্ধ, ইহুদি, খ্রিস্টান বা শিখ যে কোন জাতিই বাস করুক তাদেরকেই সাধারণতঃ হিন্দু বলা হ’তো। প্রাচীন ইতিহাস, ভূগোলের দৃষ্টিকোণ থেকে পাকভারত উপমহাদেশের সকলেই আমরা হিন্দু।

প্রচলিত হিন্দু ধর্মের মূল নাম সনাতন ধর্ম অর্থাৎ সত্য ধর্ম এর মূল বাণী ‘ঔঁ’ অর্থাৎ ‘শান্তি’ এটিই আরবিতে ‘ইসলাম’; বেদ-গীতার অনুসারিদের আর্য জাতি বা ভদ্র, নম্র বা আদর্শ জাতি বলা হ’তো, আরবিতে যাকে ‘মোসলেম’ বলা হয়।

পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে যে, প্রচলিত মোসলমান ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম ইহুদি ইত্যাদি ধর্ম বলতে কোন ধর্ম বা জাতি নেই আর তাদের গ্রন্থেও ঐ নামের কোন ধর্ম নেই। ইহা স্ব স্ব দলের স্বার্থবাদী মৌলবাদ কর্তৃক সংযোজিত ও প্রণীত। অতীতের কোন ধর্মগ্রন্থই অপরিবর্তীত না থাকলেও তা যে একই ছিল তার কিছু কিছু সাক্ষ্য বহন করে প্রত্যেকটি গ্রন্থে এমনকি উপধর্মগ্রন্থেও। বেদ, গীতা সবচেয়ে পুরানো বিধায় সংক্ষেপে বেদ- কোরানের সাদৃশ্য ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু বাণী নিম্নে প্রদত্ত্ব হলো:

১. গীতা: ‘একমেবা দ্বিতীয়ম’, অর্থ: এক (উপাস্য) ছাড়া দ্বিতীয় নেই।

কোরান: ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই ।

২. গীতা: ‘হি জাতস্য মৃত্যু; ধ্রব মৃতস্য চ জন্ম ধ্রবং; তাষ্মাৎ তং শোচীতুং ন অহর্সি’। [গীতা-শ্লোক-২৭ ] অর্থ: যে জন্মে তার মরণ নিশ্চিত, যে মরে তার জন্ম নিশ্চিত। সুতরাং অবশ্যাম্ভাবী বিষয় তোমার শোক করা উচিৎ নয়।

কোরান: অ তুখরিজুল হাইয়া মিনাল মাইয়াতি অ তুখরিজুল মাইয়াতা মিনাল হাইয়া। [৩: ২৭; ৬: ৯৫] অর্থ: তুমিই মৃত থেকে জীবন্তকে টেনে বার করো আবার জীবন্ত থেকে মৃতদের টেনে বার করো।
৩. বেদ: যে ধনবান লোক পরকে প্রতিপালন করে না তাকে ঘৃণা করি। [বেদ: ১/১২০/১২]।

কোরান: --অ মীম্মা রাজ্জাকনা হুম ইউনফেক্বুন-।-অ ইয়ামনাউনাল মা-উন। [ ২: ৩; ১০৭: ৭ ] অর্থ: তারাই সফলকামী যারা তাদের ধন-সম্পদ থেকে সাহায্য করে।--ধংস হোক, যারা প্রতিবেশীদের সহযোগিতা করে না।

৪. বেদ: তোমাদের অভিপ্রায় এক হোক, হৃদয় এক হোক, মন এক হোক, তোমরা যেন সর্বাংশে সম্পূর্ণরূপে একমত হও। [বেদ:১০/১৯১/৪]

কোরান: অ আতাছি’মু বি- হাবলিল্লাহি জামিয়া-অ লা তাফাররাক্বু। [৩: ১০৩] অর্থ: তোমরা আল্লাহর রজ্জু একত্রে মজবুতভাবে আকড়ে থাকো। তোমরা বিভিন্ন মতে এবং দল উপ-দলে বিভক্ত হইও না।

৫. গীতা: যিনি বিশ্বকর্মা, তার মন বৃহৎ তিনি নিজে বৃহৎ, তিনি নির্মাণ করেন, ধারণ করেন, তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন।

কোরান: অ লীল্লাহীল মুলকোচ্ছামা-অতি অল আর্দ্ব- ক্বাদির। [৫: ১৭] অর্থ: দৃশ্য-অদৃশ্য এবং ইহার মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছুরই সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্ব শক্তিমান।

৬. বেদ: যিনি আমাদের জন্ম দাতা, পিতা, যিনি বিধাতা, যিনি বিশ্ব-ভূবনের সকল ধাম অবগত আছেন। তিনিই একমাত্র। অন্য সকল ভূবনের লোকে তার বিষয় জিজ্ঞাসাযুক্ত হয়। [বেদ-১০/৮২/৩]

কোরান: হু অল্লা হুল্লাজী লা ইলাহা ইল্লা’হুঅ, আল মালেকুল কুদ্দুছুচ্ছালা-মুতাকাব্বেরু; ছুবতানাল্লাহি- ইউসরেক্বুন। [৫৯: ২৩] অর্থ: তিনি আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তিনিই পবিত্র, তিনিই শান্তি, তিনিই নিরাপত্তা বিধায়ক, তিনিই রক্ষক, তিনিই পরাক্রমশালী, তিনিই প্রবল।

৭. বেদ: বিশ্ব নিখিলের সর্বত্র যে সকল কাজ হয়ে চলছে প্রকৃতপক্ষে তার মূলে কোন দেবতা নেই, আছেন কেবল এক ঈশ্বর। সকল কিছুই তার অধীন, তার নিয়ন্ত্রণে সকল কিছুই। তিনি ছাড়া দ্বিতীয় নেই।- যিনি ছয় লোক স্তম্ভন করেছেন। যিনি জন্ম রহিত রূপে নিবাস করেন, তিনি সেইই একক। [বেদ-১/১৬৪/৬ ]

কোরান: আল্লাহু লা ইলাহা ইল্লা-হুঅল হাইয়ুল কাইয়ুম-। [২: ২৫৫] অর্থ: আল্লাহ তিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব, অনাদি। তাঁকে তন্দ্রা, নিদ্রা স্পর্ষ করে না। দৃশ্য-অদৃশ্যে যা কিছু আছে সবই তাঁর- -তাঁর আসন দৃশ্য-অদৃশ্য ব্যাপীয়া পরিব্যপ্ত; ইহাদের রক্ষণা-বেক্ষণে তিনি ক্লান্ত হন না, তিনি কল্পনাতীত ও মহামহিম।

৮. বেদ: ঐশ্বরীক বল এবং দেবতাদের কাজ-এ দু’য়ের মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই। [বেদ-১/১৭]

কোরান: অর্থাৎ; ইন্নাল্লাজীনা ইয়াকফুরনা বি-ল্লাহী অ রুছুলীহী- হাক্বান। [৪: ১৫০, ১৫১] অর্থ: যারা আল্লাহ ও রাছুলদের প্রত্যাখ্যান করে এবং তাঁদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে-প্রকৃত পক্ষে ইহারাই কাফির এবং ইহাদের জন্য কঠিন লাঞ্চনাদায়ক শান্তি রয়েছে।

৯. বেদ: ঈশাবাস্য মিদং সর্বযৎকিঞ্চ জগতাং জগৎ।

কোরান: অ কানাল্লাহু বিকুল্লে শাইঈম্মুহিত। অর্থ: একমাত্র আল্লাহ জগতের সব কিছুকে বেষ্টন করে আছেন।

১০. বেদ: যুচক্ষুষা না পশ্যাতি যেন চক্ষুংষি পশ্যাতি।

কোরান: লা তুদ্রিকুহুল আবছারু অ ইউদরিকুল আবছারা। অর্থ: নিরাকার আল্লাহকে অন্তর চক্ষুদিয়ে দেখতে হয়।

১১. বেদ: সূক্ষ্ম তৎসূক্ষ্ম তরং বিভাতি সবেত্তি বেদ্যং।

কোরান: অহুয়ল লতিফুল খবির। অর্থ: তিনি নিরাকার নির্বিকার জ্ঞানের আধার।

১২. বেদ: যতো বাচো নিবর্তন্তে অপ্রাপ্য মনসা স:।

কোরান: ছুম্মারজিয়িল-হাছির। অর্থ: দৃষ্টি ও কল্পনারও উর্দ্ধে সে।

১৩. বেদ: নতস্য প্রতিমা অস্তি।

কোরান: লাইছাকা মিছলি শাইউন। অর্থ: তার কোন উদাহরণ নেই।

১৪. বেদ: জ্যোতিসামপি তজ্জোতিস্ত।

কোরান: নুরুন আলা নুর। অর্থ: তিনি জ্যোতির জ্যোতি।

১৫. বেদ: একমেবাদ্বিতীয়ম নেহনা নাস্তি কিঞ্চন, নায়ং কুতশ্চিন বভুব কশ্চিৎ।

কোরান: আল্লাহু আহাদ, লা ইলাহা গাইরুকা, লাম ইয়ালিদ অলাম ইউলাদ। অর্থ: তিনি একাকার, অদ্বিতীয়, তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তিনি জাত নন এবং তার কোন জাতক নেই।

১৬. বেদ: আত্মানং বিদ্ধি।

কোরান: অ’লামু- অ- তুহশারুন। [৮: ২৪ ] অর্থ: জেনে রেখো! আল্লাহ জীবের জীবনের কেন্দ্র বিন্দু হৃদয় অবস্থিত (হৃদয়ের গভীরে)। আর তাতেই তোমরা ফেরৎ যাবে।

১৭. শ্লোক: অসিত গিরি সমং স্যাৎ কজ্জুলং সিন্দু পাত্রে সুর তরুবর শাখা লেখনি পত্রমুর্বী লিখতি যদি গৃহিত্বা সারদা সর্বকালং তদপিতব গুনানামীশ পারং যাতি।

কোরান: অ লাও আন্না মা ফিলআর্দ্বে-হাকিম।অর্থ: পৃথিবীর সকল বৃক্ষ যদি কলম হয় এবং এই যে সমুদ্র ইহার সহিত যদি আরও সাত সমুদ্র যুক্ত করে কালি করা হয় তবুও আল্লাহর বর্ণনা নি:শেষ হবে না। আল্লাহ পরাক্রমশালী বিজ্ঞানময়।

১৮. ঋক:তিনি আকাশে বিচরণ করেন ভূমিতে বাস করেন।

কোরান: তার আসন আকাশ ও জমিন ব্যপীয়া।

১৯. ঋক: দিবারাত্র পরস্পর সঙ্গত হয়ে আসছে এবং যাচ্ছে।

কোরান: রাতকে দিনে এবং দিনকে রাতে পরিবর্তন করে।

২০. ঋক: আকাশ ও পৃথিবী পরস্পরকে বৃষ্টি ও বাস্পরূপে রস দান করছে।

কোরান: আল্লাহ আকাশ থেকে যে জল বর্ষণ করে মৃতুভূমিকে জীবিত করেন এবং সকল প্রকার প্রাণী তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
উল্লিখিত উদাহরণ ছাড়াও বেদ-গীতার অসংখ্য বাণী আছে যা কোরানের সঙ্গে হুবহু মিল। এছাড়া নতুন-পুরাতন প্রচলিত বাইবেলের সঙ্গে এর চেয়েও বেশি মিল দেখা যায়। অতএব এদের গ্রন্থবাহকগণও যে নিঃসন্দেহে ভাষার পার্থক্যে একাকার আল্লাহর রাছুল-নবি ছিলেন! এমনও প্রমান পাওয়া যায় যে, ভাষা, স্থান, কাল ভেদে একই ব্যক্তির জীবন চরিত ভিন্ন রূপ ধারণ করে।
উদাহরণ স্বরূপ:
মহাভারতের শান্তি পর্বের ৩৩৯ নং অধ্যায়ে বর্ণিত আছে যে, নারায়ণ ব্রহ্মাকে সৃষ্টি করে তাকে বর প্রদান করেন যে, “ব্রহ্মা সর্বকালে সর্বলোকে মানুষের অধ্যক্ষ হবেন।” এ কথাই বাইবেলের আদিপর্বের ১২:৩ আয়াতে বলে যে, “পৃথিবীর যাবতিয় গোষ্ঠী তার দ্বারা আশীর্বাদ প্রাপ্ত হবেন।” অনুরূপ একই ব্যক্তির কথা কোরান বলছে, ‘কালা ইন্নি যায়েলুকা লীন্নাছে ইমামান।’ [২: ১২৪] অর্থ: (আল্লাহ) বললেন, নিশ্চয়ই আমি তোমাকে মানব জাতির ইমাম করেছি।
ব্রহ্মা সম্বন্ধে মহাভারতে বর্ণিত, “পিতা ব্রহ্মা এক পর্বতে যজ্ঞ করেছিলেন এবং সেখানে একটি ব্রহ্মশালা প্রতিষ্ঠিত আছে। ব্রহ্মা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কূপ প্রদক্ষিণ করতে হয়। এই কূপে কেশমুন্ডন করে স্নান করলে পূণ্য অর্জিত হয়; ব্রহ্মাকে পৌত্তলিকগণ অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করেছিল, কেশাগ্র পর্যন্ত অগ্নি স্পর্ষ করতে পারেনি ইত্যাদি” ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে ইব্রাহিমের মুর্তি ভাঙ্গা, অগ্নিতে নিক্ষেপ, কোরবানী, কাবা ঘরের কাহিনী, জমজম কুপ, কেশমুন্ডন করে সেলাই বিহীন কাপড়ে কাবা প্রদক্ষিণ ইত্যাদি হুবহু মিল রয়েছে। আজও ব্রাহ্মণ, পুরেহিত, বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ সেলাই বিহীন কাপড় ও মাথা মুন্ডন করে পুজা পাঠ করেন।
হিন্দুদের দাবি বেদ-গীতা নকল করে বাইবেল রচিত হয়েছে; খ্রিস্টানদের দাবি বাইবেল নকল করে কোরান রচিত হয়েছে। মোসলমানগণ এসকল দাবি খন্ডাতে পুরোপুরি ব্যর্থ তদুপরি তারা দাবি করছে কোরানের অনুসরণে আজকের বিজ্ঞান অনবরত আবিষ্কার করে চলছে। মূলতঃ সকলের দাবি সত্য যেহেতু একই সংবিধান। তাই কোরানে আল্লাহর ঘোষণা ‘অতীতের সকল ঐশী গ্রন্থের সংরক্ষক ও সমার্থক এই কোরান। এতে নতুন কিছুই নেই। আল্লাহর বিধানে (সুন্নতে) কখনও রদবদল হয় না।’ অতএব সকল ঐশী গ্রন্থের যেখানে যেখানে মিল আছে তা আলবৎ একই আল্লাহর এবং যেখানে মিল নেই তা চতুর, ধুরন্দর মনুষ্যরূপী ইবলিসের রচিত ও সংযোজিত শরিয়ত।
‘নবি-রাছুল শেষ নয়’ অধ্যায় অসংখ্য আয়াতে পরিস্কার ঘোষণা করে যে, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ঐশী গ্রন্থের উপর যারা বিশ্বাস করে/করবে তারাই উপাস্যের প্রদর্শিত পথে স্থির রয়েছে এবং তারাই সফলকামী।
আয়াতগুলির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আল্লামাগণ এটাই বুঝাতে চান যে, ‘অতীতের ঐশী গ্রন্থ সত্য ছিল, তা সত্য সত্যই আল্লাহর কেতাব ছিল, নবিগণ সত্য ছিল, শুধু এটুকুই বিশ্বাস করতে হবে, মানতে হবেনা।’
আল্লাহর অহি ছিল, সত্য ছিল, মানব কল্যাণের নিমিত্তে ছিল অথচ মানতে হবে না, এ কেমন কথা! ধারণাটি একান্তই ব্যক্তিগত ও বালসুলভ এবং আয়াতটির সঙ্গে তিল পরিমাণও সম্পর্ক নেই বলেই মনে হয়। কোরান বার বার ঘোষণা করে যে, এই কোরান অতীত গ্রন্থের বিশদ ব্যাখ্যা এবং উহারই সমার্থক, সংরক্ষক মাত্র। অর্থাৎ অতীতের সকল ঐশী গ্রন্থ মানেই এই কোরান; এতে তিল পরিমাণও নতুনত্ব নেই। অতএব ওটা ‘বিশ্বাস করতে হবে, মানতে হবে না,’ কথাটার কোন বিষয়বস্তু নেই বলেই মনে হয়। কারণ এতে কোরানকেই অস্বীকার করা হয়। বরং “বেদ, শ্রুতি, গীতা, অর্থব, সামীয়, ইয়াসরেবীয়, ত্রিপিটক, জেন্দাবেস্থা, তোরাহ, ইঞ্জীল ইত্যাদি ঐশী গ্রন্থ মানেই কোরান।” এটাই আয়াতের প্রধান বিষয়বস্তু। এর পরেও যদি কারো সন্দেহ থাকে, তবে পুনঃ দেখুন ‘সুন্নত’ অধ্যায়; সেখানে আল্লাহ কয়েকবার ঘোষণা করেছে যে,‘আল্লাহর বিধি-বিধান বা সংবিধানে কখনও কোন পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা রদ-বদল হয় না; অর্থাৎ ভাষাভেদে কোরান কালাকালভেদী অপরিবর্তনীয় ছিল আছে এবং থাকবে। আদম থেকে আজ অবধি অতঃপর ভবিষ্যতেও আল্লাহর এই বিধানে পরিবর্তন হবে না, একমাত্র ভাষার ব্যবধান ছাড়া।
কোরানের ঘোষিত ভাবধারা মতে কোরানকে বিশ্ব সমাজে উপস্থাপন করলে, আজ বিশ্বের জন সংখ্যার ৯০% শতাংশই ‘মোসলেম’ (ভদ্র, আর্য, আদর্শ বা শান্তিবাদী) নামেই পরিচিত হ’তে গর্ববোধ করতো, সাম্প্রদায়িকতার মূল উৎপাটিত হ’তো এবং পৃথিবীর অর্ধেক সম্পদ মানুষ হয়ে মানুষের খুনে গোলা-বারুদ, এটম বোমাও তৈরি করতে হ’তো না।
আল্লামাদের ধারণা, অতীতের গ্রন্থ মানতে গেলে, যিশুকে আল্লাহ বলতে হয়, ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করতে হয়, হিন্দুদের মতে, ৩৩ কোটি দেবতার পুজা করতে হয়, বৌদ্ধদের মত নিরীশ্বরবাদী হ’তে হয় ইত্যাদি; তাছাড়া কোরানে অতীতের সকল ধর্ম অবৈধ ঘোষণা করেছে ইত্যাদি।
প্রধানতঃ অতীতের সকল ধর্মাধর্ম ও বিশ্বাস মনুষ্য রচিত উপনিষদ, টেস্টামেন্ট তথা দু’নম্বরী বা উপ-ধর্ম গ্রন্থ ভিত্তিক; ঐশী গ্রন্থভিত্তিক নয় বলেই কোরানে ওটা অবৈধ ঘোষণা করেছে। আর সেই একই ঘোষণা মতে মোসলেম জাতির মনুষ্য রচিত যত উপ-ধর্ম গ্রন্থ আছে, সেগুলিও অবৈধ বলে বিবেচিত হওয়া একান্ত যুক্তিসঙ্গত ।