“মানুষের দেহ বৃক্ষের পাঁচ টি ডাল “- মানুষের শরীর কে যদি একটা জীবন্ত গাছের সঙ্গে তুলনা করা যায়, তবে চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক এই পাঁচটি ইন্দ্রিয় দেহ বৃক্ষের পাঁচটি শাখা স্বরূপ, যা মানুষের জীবন কে নিয়ন্ত্রণ করে।
“চঞ্চল চিত্তে কাল প্রবেশ করে” - ইন্দ্রিয় গুলি মানুষ কে ভোগময় জীবনের প্রতি আকৃষ্ট করে। মানুষ যত ভোগ করে তত ভোগের স্পৃহা বাড়ে। ভোগ বিলাসে অভ্যস্ত মানুষ ভোগের ব্যাঘাত ঘটলেই অসহিষ্ণু হয়ে পড়ে। তখন মন অশান্ত হওয়ার ফলে মনের উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ফলে, অনিয়মিত ও বিশৃঙ্খল জীবন যাপনের দরুণ শরীরে কাল রূপী ব্যাধির আবির্ভাব ঘটে।
“মনকে দৃঢ় করে মহাসুখ পাও” - মনকে যত দৃঢ়তার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, মন তত শান্ত হয়। অশান্ত মন কখনই ঈশ্বর সাধনার উপযোগী হয় না। এ জন্য যোগী গণ ঈশ্বর সাধনার অঙ্গ হিসাবে নানা যোগ ব্যায়াম, প্রাণায়াম প্রভৃতির সহায়তায় চিত্ত সংযম করেন। কৃচ্ছ সাধনে মন যত সফল হয়,ভবিষ্যতে ঠিক সেই অনুপাতে সুখ বৃদ্ধি ঘটে।
“গুরু কে জিজ্ঞাসা করে সব জেনে নাও” - নির্বাণ লাভের জন্য যে প্রজ্ঞা ও উচ্চভাব মার্গে বিচরণের উপযুক্ত মানসিক দৃঢ়তা ও দূরদৃষ্টির প্রয়োজন হয়, তা একমাত্র ধর্ম সাধকেরাই অর্জন করতে পারেন। সে জন্য সাধন পথে অগ্রসর হতে গেলে সতত গুরু সঙ্গ প্রয়োজন । গুরুদেব জ্ঞানাঞ্জন শলাকার ছোঁয়ায় শিষ্যের জ্ঞান চক্ষুর উন্মীলন ঘটালে তবেই শিষ্য সাধনার উপযুক্ত হন। গুরুর কাছ থেকে মুক্তির উপায় জেনে নিলে সাধন পথের বাধা বিঘ্ন গুলিকে সহজেই অতিক্রম করা যায়।
“সুখে বা দুঃখেতে মরণ যখন নিশ্চিত, তখন সব সময়ে তপস্যা করে কি হবে ?” - মানুষ মরণশীল। জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর হাত থেকে কারও রক্ষা নেই। বৌদ্ধ শাস্ত্র মতে সর্ব প্রকার বন্ধন থেকে মুক্তিই হচ্ছে মানব জীবনের প্রধান লক্ষ্য। নির্বাণ লাভ করতে পারলে সর্বপ্রকার বন্ধন থেকে মুক্তি ঘটে এবং পুনর্জন্ম হয় না। কিন্তু বোধিলাভ ছাড়া নির্বাণ সম্ভব নয়। উপাসনার মাধ্যমে উদ্ভাসিত আধ্যাত্মিক উপলব্ধি ও পরম জ্ঞানকেই বোধি বলা হয়। তাই মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তপস্যার মাধ্যমে বোধি লাভ ও বোধি লাভে প্রাপ্ত জ্ঞানের সহায়তায় নির্বাণলাভের প্রয়োজনেই তপস্যা ।
“এই ছন্দের বন্ধন এবং ইন্দ্রিয়ের পারিপাট্য ছেড়ে শূণ্য পাখায় ভর করে তার কাছে যাও “ – মুক্ত পক্ষ পাখীর মত শূন্য মার্গ অবলম্বন করলে অর্থাৎ জাঁকজমক বা ইন্দ্রিয়ের পারিপাট্য সমূহের অকারণ ভার পরিত্যাগ করলে মন মুক্ত হয়, এবং মুক্ত মন মুক্তির সহায়ক হয়। মুক্তি লাভ করলে আত্মা বুদ্ধে বিলীন হয়।
“লুই বলে আমি শ্বাস-প্রশ্বাসের পিড়ায় বসে ধ্যানে সব দেখেছি ” - লুইপাদ নিজেই ছিলেন একজন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য। বৌদ্ধ ধর্মের সাধন তত্ত্ব তার জানা ছিল। শ্বাস-প্রশ্বাসের নিয়ন্ত্রণ বা কুম্ভক সমাধি দ্বারা দেহের প্রকৃতি দোষ খণ্ডন করে, নির্বিকল্প সমাধিতে বোধি চিত্তকে নির্বাণ মার্গে চালিত করলে মহাসুখ সঙ্গম হয় বা সাধনায় সিদ্ধিলাভের আনন্দ উপলব্ধি হয়, এই কথাই পরিশেষে তিনি উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, বজ্রযানী ও সহজযানী পন্থী সিদ্ধাচার্য গণ সন্ধ্যা ভাষায় অতি সহজ কথায় চর্যাপদগুলি রচনা করলেও বাস্তবে তা ছিল দ্বৈত অর্থবহ, দুরূহ এবং সাধন তত্ত্বের গভীর ভাবব্যঞ্জনায় পরিপূর্ণ।।
মায়াপ্রপঞ্চ ও দ্বৈতবোধের উর্ধ্বে স্থিত যে ‘বোধিচিত্ত’, তাকে সকল প্রকার দ্বৈতবোধ পরিহার করে সাধন যোগে অবধূতিকা মার্গের পথে ‘মহাসুখকমল ’-এ স্থিত করে যদি সাধক মহাসুখ লাভ করেন, তবে মায়াময় পৃথিবী সম্পর্কে জ্ঞানরহিত হন। কুক্কুরীপাদ নামক এক বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য এই তত্ত্বের ভাবকল্পে গবড়া রাগে গীত এই চর্যাপদটি রচনা করেন:
কুক্কুরীপাদানাম্
রাগ–গবড়া
দুলি দুহি পীঢ়া ধরণ ন জাই ।
রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাই ॥
আঙ্গন ঘরপণ সুন ভো বিআতী।
কানেট চোরে নিল অধরাতী।।
সসুরা নিদ গেল বহুড়ী জাগই।
কানেট চোরে নিল কা গই মাগই।।
দিবসহি বহুড়ী কাউহি ডর ভাই।
রাতি ভইলে কামরু জাই।।
অইসনী চর্য্যা কুক্কুরীপা এঁ গাইল।
কোড়ি মাঝেঁ একু হি অহি সমাইল।।
[ শব্দার্থ:দুলি = কাছিম, দুহি =দোহন করে,পীঢ়া = পাত্র/ ভাঁড়, ধরণ = ধারণ করা, রুখের = গাছের, তেন্তলি = তেঁতুল, কুম্ভীর= কুমীর, আঙ্গণ = প্রাঙ্গন/আঙ্গিনা, সুন = শোনো, ভো=ওহে, বিআতি = বাদ্যকরী, কানেট = কানের অলঙ্কার, অধরাতী = মধ্য রাত্রি, সসুরা =শ্বশুর, বহুড়ী = বধূ, মাগই = চাইবে, কাউ = কাক, ডর = ভয়, কামরু = কামরূপ, অইসনী = এইরকম, কোড়ি = কোটি, একু = একজন, সমাইল = বুঝতে পারলো।]
প্রাকৃত বাংলা ভাষায় লিখিত এই চর্যাপদ কে বিশুদ্ধ বাংলায় রূপান্তর করলে সাধারণ অর্থ দাঁড়ায় :
মাদী কাছিমের দুধ দোহন করে ভাঁড়ে ধরে রাখা যাচ্ছে না। গাছের তেঁতুল কুমীরে খায়। ওগো বাদ্যকরী শোনো,
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন